আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে সাত দফা শর্তসংবলিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় পাঠানো এ প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর দাবি জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকির মধ্যেই তেহরানের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হলো। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেওয়া সাতটি শর্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনাতেও বসবে না তেহরান।
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের পাঠানো প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো ইরানের সাতটি প্রধান দাবি হলো—
১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ: লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার: ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা সব ধরনের নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে।
৩. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
৪. জব্দ সম্পদ ফেরত: বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব জব্দ করা আর্থিক সম্পদ মুক্ত করে দিতে হবে।
৫. মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং সেনাসংখ্যা কমাতে হবে।
৬. ক্ষতিপূরণ প্রদান: সংঘাতের কারণে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৭. ভবিষ্যৎ হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা: ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এদিকে ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও দুই দেশের অবস্থানে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যেকোনো প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। পাল্টা জবাবে তেহরান জানিয়েছে, সংঘাত আবার শুরু হলে আরও ব্যাপক ও ভয়াবহ হামলা চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে-এমন আশঙ্কার মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীরা তৎপরতা বাড়িয়েছেন। তবে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান কূটনৈতিক সমাধানের পথকে কঠিন করে তুলছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এর জবাবে ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান। পরে সংঘাতের প্রভাব লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েও ছড়িয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল নিয়ে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরানের সাত দফা প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে অঞ্চলটিতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।


