সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা যুগোপযোগী ও যৌক্তিক করার লক্ষ্যে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন বেতন স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।এতে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডে সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬’ অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন বেতন স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করা হয়।বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।দুই অর্থবছরে বাস্তবায়নবেতন স্কেলের আর্থিক প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার একযোগে পুরো বেতন স্কেল বাস্তবায়ন না করে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আগে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ভাতাগুলো ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমিত করা সম্ভব হবে। বাড়ছে পেনশননতুন বেতন স্কেলে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (OROP) ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগের অবসরগ্রহণকারীদের তথ্য না থাকায় OROP একবারে বাস্তবায়ন না করে ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।এর পরিবর্তে বর্তমানে অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন স্ল্যাবভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়বে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়বে।সরকার বলছে, এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে। প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা, সবার জন্য মোবাইল ভাতাপ্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো ‘প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা’ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।এ ছাড়া ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে। এত দিন শুধু ৫ম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী সব গ্রেডের কর্মচারী এই ভাতা পাবেন। উপকারভোগী প্রায় ৩৩ লাখনতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্কের (এমটিবিএফ) আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সরকার সচিব কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেই মন্ত্রিসভা নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে।এদিকে জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এতে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার বিস্তারিত বিধান থাকবে।


