নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এসআইএস) স্থাপন, মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের মহাপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, এ অভিযোগে কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাহিদুর রহিম জোয়ারদারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে।
একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটার নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগেও পৃথক অনুসন্ধান চলছে বলে জানান তিনি।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমে অনিয়মের অভিযোগে গত ১৩ জানুয়ারি অনুসন্ধান শুরু হয়। গত ৯ এপ্রিল দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে এ অনুসন্ধানের তথ্য জানায়। অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় সংস্থার সহকারী পরিচালক প্রবীর কুমার দাসকে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জাহিদুর রহিম জোয়ারদার, তার কোম্পানি এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলী ‘পরস্পর যোগসাজশে’ সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনা, মেরামত ও সংস্কারের নামে সরকারি অর্থ ‘আত্মসাৎ’ করেছেন। একই সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৮ সালে সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের কাজ করে জাহিদুর রহিমের কোম্পানি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের জাতীয় সংসদ ভবন কার্যালয়ের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আস্রাফুল হকের তত্ত্বাবধানে ওই কাজ চলে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনে প্রবেশ করলে ভাঙচুর করলে সাউন্ড সিস্টেমটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটি সচল করার উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর।
আগের ঠিকাদার কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড তখন পরীক্ষা করে জানায়, মেরামতের মাধ্যমে এটি আবার চালু করা সম্ভব।
দুদকের নথি অনুযায়ী, সাউন্ড সিস্টেম মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় ৯ কোটি ৪ লাখ টাকার সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব তৈরি করা হয়। এর বাইরে সিস্টেমটি পরীক্ষা করতে প্রকৌশলীদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও সম্মানী বাবদ ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা চেয়ে আবেদন করে ওই কোম্পানি। সাউন্ড সিস্টেম সংস্কার ও মেরামতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সংসদ ভবনে স্থাপিত শিওর ব্র্যান্ডের পুরোনো সাউন্ড সিস্টেমটির সমমানের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পণ্য এখন আর উৎপাদন করা হয় না। এরপরও পুরোনো সিস্টেম মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে দরপত্র, কার্যাদেশ, ব্যয়ের হিসাব, বিল-ভাউচার, নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন নথি চায় দুদক।
গত ১৬ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি এসব নথি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পাওয়ায় ৭ এপ্রিল আবারও তাগিদ দেয় সংস্থাটি। সে সময় দুদক জানায়, প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় অনুসন্ধানে বিলম্ব হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিন গত ১২ মার্চ শব্দযন্ত্রে বিভ্রাট দেখা দেয়। এ কারণে অধিবেশন কিছু সময় বন্ধ রাখতে হয়। পরদিনও হেডফোন ও শব্দযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্যরা।
এরপর ৫ এপ্রিল আবারও শব্দযন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়। সেদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, তার নিজের মাইকও কাজ করছিল না। পরে মেরামত ও নামাজের বিরতির জন্য অধিবেশন ৪০ মিনিট মুলতবি করা হয়।
এসব বিভ্রাটের পেছনে কোনো অন্তর্ঘাত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করে সংসদ কমিটি।
এর মধ্যে গত ১৬ এপ্রিল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা প্রবীর কুমার দাসের নেতৃত্বাধীন একটি দল।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের কাছে জাহিদুর রহিম দাবি করেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের বিদ্যুতের তারের সংযোগ ঢিলা হয়ে যায়। এর ফলে অধিবেশনে টেবিল চাপড়ানোর সময় সাউন্ড সিস্টেমে বিভ্রাট ঘটছিল।
সংস্কারকাজের প্রথম ধাপে যুক্ত আমানত এন্টারপ্রাইজের কারিগরি অভিজ্ঞতার ঘাটতিকেও দায়ী করেন তিনি। তার দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানের কাজের পর শেষ পর্যায়ের সংস্কার তার কোম্পানিকে করতে হয়েছে।
সাবেক এমপির বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন
খুলনা-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. রশীদুজ্জামানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে কত টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে ব্রিফিংয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।


