নিউজ ডেস্ক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভাষণে তিনি বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারসহ নানা বৈশ্বিক ও জাতীয় ইস্যু তুলে ধরেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় অনুযায়ী জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বনেতাদের সামনে ভাষণ দেন তিনি।
ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি স্মরণ করেন তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে, যারা অতীতে একইভাবে এই মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ ও থ্রি-আর কৌশল
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে দেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
তিনি জানান, ফ্যাসিবাদী শাসনে ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র মেরামতে সরকার বর্তমানে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন’ বা থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে। তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের স্টার্টআপের জন্য চলতি বাজেটে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই
দীর্ঘ ৯ বছরের বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর সৃষ্ট চাপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীকে মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।’
এ সংকট সমাধানে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সমর্থন কামনা করেন।
জলবায়ু ঝুঁকি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের দাবি জানান।
তিনি জানান, পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে সরকার।
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন
শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে চায় বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্ধেকের বেশি নারী। নারী শিক্ষা ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ বাড়িয়েছে এবং স্নাতক পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করেছে।
পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফার্মার্স কার্ড’, ‘স্পোর্টস কার্ড’ এবং ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এসব কার্ড সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং বিশ্বশান্তি
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের বৈষম্যের কারণ না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্বশান্তির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংঘাতের সমাধান মারণাস্ত্র নয়, বরং আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে হওয়া উচিত। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
দেশে স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশের কথা উল্লেখ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলবে। এজন্যই আমরা বলি—সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ।’


