উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।বিজ্ঞাপনআন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। বিপরীতে আগামী পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে।ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং রিজার্ভের পর্যাপ্ততা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এ হার বাস্তবায়িত হলে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের পর দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হবে। একই প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ১০. ৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৮ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে বেশি।বিজ্ঞাপনএদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১.৫৮ বিলিয়ন ডলার।রিজার্ভের এই অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিলেও আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করতে পারে।পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারবিজ্ঞাপনবাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পরিমাণ বেড়ে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এরপর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে নেওয়া বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই চাপ বাড়ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ বড় প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া বা শেষ হওয়ার পর্যায়ে থাকায় মূল ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ছে বলে ইআরডির তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ঋণ পরিশোধের এই অঙ্ক শুধু সরকারি বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে না; বিদেশি ঋণের অর্থ ডলারে পরিশোধ করতে হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তবে ঋণের কিস্তি কোন উৎস থেকে পরিশোধ হচ্ছে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায় কতটা এবং একই সময়ে নতুন ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা কত আসছে। এসব হিসাব বিবেচনায় না নিয়ে শুধু মোট ঋণ পরিশোধের অঙ্ক দিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপের পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।মূল্যস্ফীতি বাড়লে আমদানি ব্যয়েও চাপআইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যার মানে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও বেশি ডলার প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। আবার টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিকারকদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে শুধু আমদানি ব্যয়ই বাড়ে না; পরিবহন ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমে তা অন্যান্য পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে রিজার্ভের ওপর প্রকৃত চাপ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মূল্য পরিবর্তনের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি, মূল্য পরিশোধের সময়সূচি এবং বিনিময় হারও বিবেচনা করতে হবে।চাল, পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের দেশীয় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। বাজারদর নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কমানো বা আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে এবং ডলারের বিনিময় হার প্রতিকূলে থাকলে আমদানিকারকের ব্যয় পুরোপুরি কমে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ব্যবস্থাপনা, দুটি বিষয়ই নীতিনির্ধারকদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।প্রবৃদ্ধি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ঝুঁকিআইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সংস্থাটি গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের গতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।প্রবৃদ্ধি কমে গেলে রপ্তানি আয় বা বিদেশি বিনিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক চাহিদায় দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে।


