নুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ :

সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থামছে না। আর এই সুযোগকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সক্রিয় রয়েছে বিদেশ পাঠানোর মধ্যস্থতাকারী চক্র—এমন অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি লিবিয়া থেকে গ্রীস যাওয়ার পথে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে বহনকারী নৌযানে অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর পরও স্থানীয়ভাবে অভিযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
অভিবাসনপ্রত্যাশী ও তাদের স্বজনদের বক্তব্যে উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের কদ্দুছ মিয়া ও খসরু মিয়ার নাম সামনে এসেছে। তারা দুজনই এই প্রতিবেদকের কাছে কয়েকজন তরুণকে বিদেশ পাঠানোর জন্য মধ্যস্থতার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদ বা মামলা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।ডুংরিয়া গ্রামের একাধিক বাসিন্দার দাবি, কদ্দুছ মিয়া ও খসরু মিয়া একসময় কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বর্তমানে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কথা এলাকায় আলোচিত হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে তাদের আর্থিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। তবে তাদের সম্পদের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে ডুংরিয়া গ্রামে গেলে কদ্দুছ মিয়ার বাড়ির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন জানান, তিনি বাড়িতে নেই। পরে গ্রামের পাশের সড়কে তার দেখা মেলে।
সেখানে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে তিনি একটি ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে কথোপকথনের একপর্যায়ে কদ্দুছ মিয়া স্বীকার করেন, পাগলা শত্রুমর্দন এলাকার রন্টু পালের ছেলে হৃদয় পাল এবং ডুংরিয়া গ্রামের উত্তরপাড়ার ইছন মিয়ার ছেলে সোহেল মিয়াকে বিদেশ পাঠানোর বিষয়ে তার মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়েছে।হৃদয় পালের বাবা রন্টু পালও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বুধবার তিনি জানান, তার ছেলে হৃদয়কে বিদেশ পাঠানোর জন্য কদ্দুছ মিয়ার সঙ্গে ১৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। হৃদয় লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি ডুংরিয়া বাজারে গিয়ে কদ্দুছ মিয়াকে ছয় লাখ টাকা দেন। বাকি সাত লাখ টাকা শান্তিগঞ্জের একজন দোকানির কাছে জমা রয়েছে বলে জানান তিনি।
রন্টু পাল বলেন, মঙ্গলবার রাতে কদ্দুছ মিয়া তাকে জানিয়েছেন, তার ছেলে হৃদয় মিসরের ‘সাইদ পোর্টে’ রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে তিনি ছেলেকে ভিডিও কলে দেখানোর জন্য কদ্দুছ মিয়াকে বলেছেন। শান্তিগঞ্জের পাথারিয়ার তরুণ আব্দুল করিমের বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রেও ডুংরিয়ার খসরু মিয়ার মধ্যস্থতার অভিযোগ রয়েছে। আব্দুল করিমের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সরকারি মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।খসরু মিয়া বুধবার এই প্রতিবেদকের কাছে আব্দুল করিমকে পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার কথা স্বীকার করেন।
তিনি দাবি করেন, তিনি সরাসরি এ ধরনের কাজ করেন না এবং একজনকে পাঠালে ১০ হাজার টাকা পান।খসরু বলেন, আমি তো জোর করে পাঠাইছি না। যারা গেছে, মরণ জাইন্না গেছে। আমি তো কদ্দুছ মিয়ার মতো সরাসরি কাজ করি না। বেশি বেশিও করি না। আরও মাইনসে (মানুষে) ই-কাম করে।
একজন পাঠাইলে আমি মাত্র ১০ হাজার টাকা পাই।গত সোমবার পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিবাসনপ্রত্যাশীর স্বজন জানান, তাদের সন্তানরা ডুংরিয়ার কদ্দুছ মিয়ার মাধ্যমে লিবিয়ার দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিল।স্বজনদের ভাষ্য, সাগরপথে গ্রীস যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে তারা আগে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না।
এখন সন্তানদের কোনো খোঁজ না পেয়ে তারা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।প্রসঙ্গত, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে একটি রাবার বোট গ্রীসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন।
স্পিডবোট ইঞ্জিনে চলা নৌযানটিতে যথাযথ নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় সেটি সমুদ্রে দিকভ্রষ্ট হয়। পরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে জ্বালানিও শেষ হয়ে যায়। শুরু হয় খাবার ও পানির তীব্র সংকট।টানা ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার সময় অনাহার, প্রচণ্ড তাপ ও পানিশূন্যতায় অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি ও দুজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। পরিস্থিতির কারণে মরদেহগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা
পরবর্তীতে ১৩ আগস্ট স্রোতের টানে নৌযানটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে ৩০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে অনেকের শরীরে ক্ষত ও সংক্রমণের সৃষ্টি হয়েছে বলে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভিডিও বার্তায় জানা গেছে। মিসরে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা বর্তমানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
প্রশাসনের কাছে নেই কদ্দুছ-খসরুর তথ্যসাগরপথে তরুণদের বিদেশ পাঠানোর সঙ্গে জড়িত দালালদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। তবে কদ্দুছ মিয়া ও খসরু মিয়ার নাম বা তাদের মধ্যস্থতার বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা। তিনি বলেন, কেউ এসব তথ্য আমাদের জানায়নি।
আমরা দ্রুতই বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকারও জানান, দালালদের বিষয়ে এখনো পুলিশকে কেউ তথ্য দেয়নি।তবে ভুক্তভোগী ও স্বজনদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির বক্তব্যে যখন স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের নাম প্রকাশ্যে আসছে, তখন তাদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা এবং বিদেশ পাঠানোর নামে অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে তরুণদের পাচার বা অবৈধভাবে বিদেশ পাঠানোর সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।


