শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জেলা প্রতিনিধি

কক্সবাজারে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ কারবারি বা ‘মূল হোতাদের’ শনাক্ত করে তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মাদক পাচারের জন্য ব্যবহৃত স্থল ও জলপথ চিহ্নিত করে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন, নৌপথে টহল জোরদার এবং মাদক বহনের কাজে জড়িত ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারে কোনো পক্ষপাত না করে নির্মোহভাবে তালিকা প্রস্তুত করা হবে। ওই তালিকার ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের হিল ডাউন সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘মাদক প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নসংক্রান্ত সভা’ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নির্মোহভাবে শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে যারা মূল হোতা, তাদের তালিকা টাস্কফোর্স তৈরি করবে। সেই তালিকার ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করব।

তিনি বলেন, ইয়াবার কারণে দেশের যুবসমাজ মাদকাসক্তির দিকে যাচ্ছে। তাই মাদকের বিস্তার রোধ করাকে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সমন্বিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রম
কক্সবাজারের মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শুধু সীমান্তে অভিযান চালিয়ে নয়, মাদক চোরাচালানের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মাদক ব্যবসার মূল হোতা, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং মাদক বহনকারী বা ‘ক্যারিয়ার’ সব পর্যায়ের ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করে সমন্বিত তালিকা প্রস্তুত করা হবে।

চোরাচালানের রুটে ক্যাম্প, জলপথেও কড়া নজরদারি
মাদক পাচারে ব্যবহৃত স্থল ও জলপথ চিহ্নিত করে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘মাদক চোরাচালানে ব্যবহৃত রুটগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। সমতলের পাশাপাশি জলপথেও নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার থাকবে।’

কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকা, পাহাড়ি পথ এবং উপকূলীয় জলপথ ব্যবহার করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। এসব মাদক পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নতুন পরিকল্পনার আওতায় স্থলপথের পাশাপাশি উপকূলীয় জলপথেও নজরদারি বাড়ানো হবে।

বাহকদেরও শনাক্ত করা হবে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক চোরাচালানে যারা বাহক বা ‘ক্যারিয়ার’ হিসেবে কাজ করছেন, তাদেরও শনাক্ত করা হবে।

সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু বাহকদের আটক করে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানা সম্ভব হবে।

সীমান্ত ও উপকূলে বাড়ছে নজরদারি
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কক্সবাজার মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, নাফ নদী এবং বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকা মাদক চোরাচালান প্রতিরোধকে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে।

বিশেষ করে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন জলপথ ব্যবহার করেও মাদক পাচারের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

এ কারণে স্থল ও জলপথ উভয় ক্ষেত্রেই নজরদারি জোরদারের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শুধু অভিযান নয়; সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং মাদক ব্যবসায় জড়িতদের সম্পদের তদন্তও সমান গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।

যুবসমাজ নিয়ে উদ্বেগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইয়াবার কারণে দেশের যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তাই চোরাচালান প্রতিরোধের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ করা গেলেও দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা থাকলে নতুন করে মাদক ব্যবসার পথ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মাদক প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নসংক্রান্ত সভায় কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় কক্সবাজারের মাদক পরিস্থিতি, চোরাচালানের সম্ভাব্য রুট, সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুই দিনের সরকারি সফরে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সকালে তিনি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) কার্যালয় পরিদর্শন করবেন। পরে কউকের ফ্ল্যাট উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর উদ্বোধন করবেন। এরপর কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পরিদর্শন এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।

দুপুরে হিল ডাউন সার্কিট হাউসে মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে সন্ধ্যায় বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন তিনি।

উল্লেখ্য, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর হওয়ার পর কক্সবাজারে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা এই প্রথম অনুষ্ঠিত হলো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করতে ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশ
পরবর্তী নিবন্ধ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হবে ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প