ছাতকে কাঠ পুড়িয়ে চুন তৈরি, বিষাক্ত ধোঁয়ায় হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

নুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ:

সুনামগঞ্জের ছাতকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধ ভাবে ব্যাঙের ছাতারমতো গড়ে উঠেছে কাঠজ্বালিত দুই শতাধিক পাজু। চুনাপাথর পুড়িয়ে চুন তৈরির এসব কারখানাকে স্থানীয়ভাবে‘পাজু’ বলা হয়।

চুনাপাথর পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে চুন। এখানে নদীর তীরে পাজু তৈরি করে চুনা পাথর পুড়ানো এটি এখানের মানুষের প্রাচীনতম একটি ব্যবসা। সে সময় চুনাপাথর পুড়ানো হতো খড় আর ছন দিয়ে আর এ সময় এসে পুড়ানো হচ্ছে কাঠ।

এক সময় পরিবেশগত কারণে এখানের পাজুগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পাজুর ব্যবসা চালু হয় ঢাকার নারায়ণগঞ্জে। সেখানেও গ্যাসের সাহায্যে চুনাপাথর পুড়ানো হতো। সম্প্রতি গ্যাস সঙ্কটের কারণে নারায়ণগঞ্জেও বন্ধ হয়ে যায় পাজুর ব্যবসা।

সেই সাথে চুনের  দামও বেড়ে যায় দ্বিগুণে। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর ছাতকে ২/৩টি পাজু তৈরি হলেও উৎপাদনে যায় নি। ২০২৫ সালে সুরমা নদীর তীরে পাজু তৈরি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ছাতক- গোবিন্দগঞ্জ সড়কের উভয় পাশে, ছাতক সুরমা সেতু সড়কের পাশসহ বৌলা থেকে কেশবপুর, লক্ষিবাউর, বারকাহন পর্যন্ত সুরমার দুই তীরে রাতারাতি গড়ে উঠে অসংখ্য অস্থায়ী পাজু।

কাঠজ্বালিত পাজু বা চুন তৈরির চুল্লিতে প্রতি মাসে পুড়ছে প্রায় ১ হাজার ৪শ’ টন কাঠ।জানা যায়, ছাতক একসময় চুনাপাথর ও চুনশিল্পের জন্য পরিচিত ছিল। খড়, ছন দিয়ে চুন পুড়ানো একটি পুরনো পদ্ধতি। পরিবেশের ক্ষতি হওয়ায় কারনে কাঠ দিয়ে চুন পুড়ানো বৈধ অনুমতি নেই। অবৈধভাবে এই কাজ করায় তীব্র বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

পরিবেশ রক্ষায় এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কড়া নজরদারি ও আইন প্রয়োগ করার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে হয়নি। অনুমোদনহীন ও যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব পাজু পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।কাঠ দিয়ে চুনাপাথর পুড়ানোর সময় বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধ। পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

এসব পাজুতে কর্মরত শ্রমিক ও মালিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সময় প্রাণহানির মতো দূর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে। গত ৯ জুন ছাতক থানাসহ সরকারী বিভিন্ন দপ্তর পরিদর্শনে এসে অবৈধ এসব চুন কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান।

কিন্তু দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত কোন অভিযান করেনি উপজেলা প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তর। দুই শতাধিক পাজুতে প্রতিদিন পুড়ানো হচ্ছে কাঠ। এতে জ্বালানি কাঠের সঙ্কটসহ বনাঞ্চল উড়ার হচ্ছে।

পরিবেশের মারাত্বক প্রভাব পড়ছে। পাজুগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি দিনদিন বাড়ছে। শুরু থেকে কোন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এর সংখ্যা। স্থানীয়দের অভিযোগ পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাজু।

জানা গেছে, প্রতিটি পাজুতে মাসে দুইবার চুনাপাথর পুড়ানো হয়। এতে প্রতিটি পাজুতে মাসে ৭টন কাঠ পুড়ছে। খড় ছনের পরিবর্তে কাঠপুড়ানো হওয়ায় এলাকায় লাকড়ির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রতিমণ লাকড়ি ১২০ টাকার পরিবর্তে দাড়িয়েছে আড়াইশো থেকে ৩শ’ টাকায়। লাকড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে।

পাজুতে পুড়ানোর জন্য গাছ-কাঠ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় অর্ধশতাধিক লাকড়িবাহী ট্রাক ও পিকআপ প্রবেশ করছে ছাতকে।স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় অবাধে চলছে পরিবেশবিধ্বংসী এসব কার্যক্রম।

পাজু থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত ঘন ধোঁয়া ও ছড়িয়ে পড়ছে চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধ। এতে পরিবেশজনিত রোগবালাইও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সাথে বিপুল পরিমাণ কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে বন উজাড় হচ্ছে। তাই এসব অবৈধ পাজু বন্ধের দাবী সচেতন মহলের।ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিন বলেন, ছাতকে শিল্প কারখানা থাকায় আগে থেকেই এ উপজেলায় পরিবেশজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি।

গত কয়েক মাসে এটি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।ছাতক পাজু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছালেক মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এটি ছাতকের প্রাচীন ব্যবসা। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশের ছাড়পত্র দিয়ে রাজস্বের আওতায় আনা হলে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয়  লাভবান হবে বলে তারা মনে করেন।

ছাতক বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস বলেন, লোকবল সঙ্কট। মাত্র ২ জন লোক দিয়ে অভিযান করা কষ্টকর। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলোচনাক্রমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই।

আমরা তাদের নোটিশ দিয়েছি, জরিমানাও করেছি। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার জন্য বন বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি। তাদের নিয়ে বসে কি করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। যেহেতু এগুলা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তাই আমরা ছাড়পত্র দেইনি, এসব বন্ধের জন্য আমরা কাজ করছি।

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহি উদ্দিন বলেন, আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর ও পাজুর মালিকদের নিয়ে শিগগিরই বসবো। অনুমোদন ছাড়া কেমন করে পাজু জ্বলছে বিষয়টি জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকক্সবাজারে বাস-জিপ সংঘর্ষে নিহত ৪
পরবর্তী নিবন্ধরাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দিলেন মঈন খান