সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :

একটি মানুষের চলে যাওয়া কখনো কখনো শুধু একটি পরিবারের শূন্যতা তৈরি করে না, শূন্য করে দেয় একটি সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের ভূইগাঁও গ্রামের বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব সামছুল ইসলামের মৃত্যুতে তেমনই এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের সামাজিক অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও মানুষের বিরোধ মীমাংসায় ন্যায়সংগত ভূমিকার জন্য যিনি ছিলেন অনেকের আস্থার জায়গা, সেই মানুষটি আর নেই।রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন সামছুল ইসলাম।
তার মৃত্যুতে ভূইগাঁও গ্রামসহ ছাতক উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহীদের অনেকেই হারিয়েছেন আপনজনের মতো একজন মানুষকে।মরহুম সামছুল ইসলাম ছিলেন ভূইগাঁও গ্রামের মরহুম রফাত উল্লাহর সন্তান।
জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক সম্প্রীতি ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছিল সালিশ-বৈঠকের একজন অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে।সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির সালিশে তার উপস্থিতি ছিল আস্থার প্রতীক।
জটিল বিরোধে ধৈর্য ধরে উভয় পক্ষের কথা শোনা, বিষয়টি গভীরভাবে বোঝা এবং ন্যায়সংগত সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা ছিল তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনেক বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ানোর আগেই তাঁর মধ্যস্থতায় সামাজিকভাবে মীমাংসা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।স্থানীয়দের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক অভিজ্ঞতা ও মানুষের প্রতি তার আন্তরিকতা।
সালিশের আসরে তিনি শুধু বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করতেন না, বরং সম্পর্ক যাতে নষ্ট না হয়, মানুষ যাতে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি ধরে রাখতে পারে সেদিকেও গুরুত্ব দিতেন।তাই তার মৃত্যুতে শুধু একজন সালিশ ব্যক্তিত্বকে হারানোর বেদনা নয় স্থানীয়দের মধ্যে কাজ করছে একজন প্রবীণ সামাজিক অভিভাবককে হারানোর কষ্টও।
অনেকের কাছে তিনি ছিলেন পরামর্শের মানুষ, সংকটে ভরসার মানুষ এবং সামাজিক অস্থিরতায় শান্তির পথ খুঁজে দেওয়ার একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি।তার চলে যাওয়ায় এখন সালিশের সেই আঙিনায় হয়তো আর শোনা যাবে না তাঁর বিচক্ষণ পরামর্শ।
কোনো বিরোধে শান্তির পথ খুঁজতে গিয়ে তার অভিজ্ঞ কণ্ঠের আশ্রয়ও আর পাওয়া যাবে না। তার রেখে যাওয়া সামাজিক ভূমিকা ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কই এখন হয়ে থাকবে স্মৃতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
মৃত্যুকালে তিনি চার কন্যা ও এক পুত্র সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।
রোববার রাত সাড়ে ৯টায় ভূইগাঁও মাদ্রাসা মাঠে মরহুম সামছুল ইসলামের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।সামছুল ইসলামের চলে যাওয়া যেন একটি নীরব বার্তা দিয়ে গেল- মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি এবং সমাজে রেখে যাওয়া ভালোবাসা থেকে যায়।
সেই স্মৃতিতেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন ছাতকের এই প্রবীণ সালিশ ব্যক্তিত্ব।মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও তার অসংখ্য গুণগ্রাহী।


