দেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক হাবে রূপান্তরের কাজ শুরু : বিমানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যে এভিয়েশন খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিমানবন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি যাত্রী ও কার্গো ব্যবস্থাপনা, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর কুর্মিটোলায় ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বর্ণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

বিমানমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের কাজ আমরা শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা। এই অগ্রযাত্রায় এভিয়েশন সেক্টর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বলেছেন, দেশের আয়না হলো এয়ারপোর্ট। এ খাত আমরা যে অবস্থানে পেয়েছি, সেখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এজন্য কাজগুলো করার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

দেশে পর্যটন বিকাশে ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মানুষ বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী নয়। এর পেছনে অনেক সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশে নদী, সমুদ্র, জঙ্গলসহ পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু থাকলেও সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়নি। এ কারণে পর্যটন ও এভিয়েশন খাতকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি আধুনিক এভিয়েশন হাবের জন্য ভালো বিমানবন্দর, কার্গোর সব সুবিধা, যাত্রীসেবার সব সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন। ৪২ বছর পর সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন নিয়ম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের জন্য যেসব নিয়ম বাধা তৈরি করছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার কাজ চলছে।

সম্প্রতি এশিয়া এয়ারের কার্যক্রম পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সেখানে আমি এমআরও, উড়োজাহাজ, অপারেশন এবং টার্নঅ্যারাউন্ড ব্যবস্থাপনা দেখেছি। মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে কীভাবে উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড করা হয়, কম খরচে কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, এসব বিষয় সরেজমিনে দেখেছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের উড়োজাহাজ নষ্ট হলে মেরামতের জন্য ভারত অথবা সিঙ্গাপুরে পাঠাতে হয়। এরপর মেরামত শেষে তা ফেরত এনে সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। বাংলাদেশে উড়োজাহাজের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি করতে সিভিল এভিয়েশন অ্যাক্ট ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। বিধিমালা তৈরির ক্ষেত্রে এয়ারলাইন্সগুলোর প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আপনারা বলবেন কীভাবে করলে আপনারা সহজভাবে কাজ করতে পারবেন। আপনাদের পরামর্শ নিয়ে আমরা মিটিং করে বিষয়গুলো চূড়ান্ত করব। বিমানের জটিল যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ক্ষেত্রে যে জটিলতা রয়েছে, তা নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বর্তমানে দেশের এভিয়েশন খাতকে ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় পাওয়ার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যাত্রী হয়রানি কমানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় লাগেজের জন্য অপেক্ষা করার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগে যাত্রীদের লাগেজ পেতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগত। এখন সেই সময় অনেক কমেছে। যাত্রী ও কার্গো একসঙ্গে দ্রুত খালাসের নির্দেশনা দেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। যাত্রীদের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কার্গোর দুটি দরজাও একসঙ্গে খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পাঁচ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, কোনো যাত্রীকে লাগেজ পেতে ৪০ মিনিটের বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও সেবার মান বাড়াতে বডি-ওন ক্যামেরা ব্যবহার হচ্ছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আগের সরকার প্রকল্পটি বাতিল করেছিল। বর্তমান সরকার তা পুনরায় চালু করেছে। প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় যে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা বিবেচনায় নিয়ে জাপানের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর ইনভেস্ট বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে জাপানের সঙ্গে মোট পাঁচবার বৈঠক করা হয়েছে। জাপানের মন্ত্রিপর্যায়ের প্রতিনিধি, এভিয়েশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, জাপানের রাষ্ট্রদূত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে এসব আলোচনা হয়েছে। দেশের স্বার্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, রাজনীতিবিদদের সব সময় দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমি মন্ত্রী হয়েছি, আমার আর কী পাওয়ার আছে? আমার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক লক্ষ্য যদি প্রধানমন্ত্রী হওয়াও হয়, তারপরও দেশের কথা আগে চিন্তা করতে হবে। এভিয়েশন সেক্টরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো আধুনিক করতে হবে। শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে এ সক্ষমতা ২ কোটি ৪০ লাখ যাত্রীর বেশি হবে।

সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। এতে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কেএম মুজিবুল হক।

সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। এ আয়োজনে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা ও দেশী-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার অন্যান্য অংশীজনরাও অংশগ্রহণ করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএমপিও শিক্ষকদের বদলির আবেদন ফের শুরু
পরবর্তী নিবন্ধহামের উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু