নুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ :

সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে থাকা প্রায় দুই হাজার গাছ কাটা হচ্ছে। বন বিভাগের অনুমোদন ও ইজারার ভিত্তিতে গাছগুলো কাটার প্রক্রিয়া চললেও গাছের প্রকৃত বাজারমূল্য, সংখ্যা, ইজারা মূল্য, অনুমোদিত সীমানা এবং কর্তন ও পরিবহনের নিয়ম মানা হচ্ছে কি না এসব নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত নিলামে বিক্রি করা ৪৩৪টি গাছের মূল্যায়ন, কাঠের পরিমাণ ও নিলাম প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’ ছাতক উপজেলা কমিটি।
বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিলামে গত ১০ আগস্ট গাছগুলো ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।
বন বিভাগের হিসাবে এতে প্রায় ৩ হাজার ৫৯১ ঘনফুট কাঠ ও ২ হাজার ৬৭১ ঘনফুট জ্বালানি কাঠ রয়েছে। গাছের প্রকৃত সংখ্যা, প্রজাতি, বয়স, বাজারমূল্য ও নিলাম প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ২৫ বছর আগে রোপণ করা এসব গাছের প্রকৃত মূল্য ইজারা মূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
ফলে গাছের সঠিক মূল্যায়ন ও নিলাম প্রক্রিয়া যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান।জানা যায়, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন অংশে ২০০২ ও ২০০৩ সালে রোপণ করা রেন্টি, মেহগনি, আকাশমনি, জাম, পিটালী, অর্জুন, ছাতিয়ান, জারুল, গামার, করই, চাম্বল, বাবলা ও কদমসহ বিভিন্ন প্রজাতির শত শত গাছ রয়েছে।
স্থানীয় গাছ ব্যবসায়ীদের মতে, প্রজাতি, আকার ও মানভেদে ২৫ বছর বয়সী এসব গাছের একেকটির বাজারমূল্য ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। অথচ অভিযোগ রয়েছে, ইজারা হিসাবে কোনো কোনো গাছের মূল্য পড়েছে মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার টাকা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন অংশে কয়েকটি লটে গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে হাসনাবাদ থেকে তাজপুর অংশের গাছ কর্তনের তথ্য ও মূল্য নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।সর্বশেষ গত ১০ আগস্ট তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ৪৩৪টি গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। এ লটের ইজারা মূল্য ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
একই সঙ্গে হাসনাবাদ থেকে ছাতক পর্যন্ত আরও ৭০২টি গাছের একটি লটের কর্তন প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ছাতক বনবিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস।তবে এসব গাছ কর্তনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনুমোদিত সীমানার বাইরে গাছ কাটা, রাতের আঁধারে গাছ কর্তন ও পরিবহন এবং ইজারার শর্ত ভঙ্গ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে তাজপুর থেকে গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত কয়েকটি এলাকায় গাছ কাটার চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিলামে নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় এসব গাছের প্রকৃত বাজারমূল্য অনেক বেশি।
এদিকে ছাতক- দোয়ারাবাজার সড়কের আরও দুটি লটে ৯২টি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চারটি লটেরই সর্বোচ্চ দরদাতা সুনামগঞ্জের সুমন আহমদ হওয়ায় ইজারা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে সরকারি গাছ নামমাত্র মূল্যে ইজারা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।তকিপুর-তাজপুর লটের ইজারা, গাছের মূল্য, সংখ্যা এবং নিলাম প্রক্রিয়া নিয়ে গত ২৪ আগস্ট ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন। সংগঠনটি গাছের প্রকৃত সংখ্যা, কাঠের পরিমাণ, বাজারমূল্য এবং নিলাম প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।অন্যদিকে দোয়ারাবাজার উপজেলার কারুলগাঁও-বেতুরা সড়কেও দুটি লটে ৯২টি গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের দাবি, সড়ক প্রশস্তকরণের স্বার্থেই গাছগুলো কাটার প্রয়োজন হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কাটার আগেই সংশ্লিষ্ট সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন সড়ক প্রশস্তকরণের যুক্তিতে গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।চারটি লটের ইজারাদার সুমন আহমদ ইজারা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রাতে গাছ কর্তন, পরিবহন এবং ইজারা সীমানার বাইরে গাছ কাটার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে কাজ শেষ করতে সময় বেশি লাগতে পারে বলে তিনি জানান।
ছাতক বনবিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস বলেন, কাগজে ভুল লেখা হয়েছে। মার্কিং মূলত গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্ট পর্যন্তই। ইজারার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন। কর্তনের শর্ত ভঙ্গ করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দোয়ারাবাজারের গাছ কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, ওয়ার্ক অর্ডার পেতে দেরি হওয়ায় রাস্তার কাজ আগে সম্পন্ন হয়ে গেছে।এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের অফিসিয়াল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।স্থানীয়দের দাবি, গাছগুলোর প্রকৃত সংখ্যা, প্রজাতি, বয়স, কাঠের পরিমাণ ও বাজারমূল্য, ইজারা সীমানা এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সড়ক প্রশস্তকরণের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সরকারি সম্পদের প্রকৃত মূল্য ও সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


