নিজস্ব প্রতিবেদক

সারাদেশে টানা বৃষ্টিপাত ও সাম্প্রতিক বন্যার অজুহাতে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম এক লাফেই অনেক দূর বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজের মতো আবশ্যকীয় পণ্যের চড়া দাম তো ছিলই, তার সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে সবজি ও ডিম-মুরগির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি। এতে করে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের দৈনন্দিন বাজেট মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে, রান্নাঘরে জ্বলছে চরম অস্বস্তির আগুন।
সবজির বাজারে শতকের হাঁক
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, রামপুরা এবং মিরপুর এলাকার বেশ কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বেশিরভাগ সাধারণ সবজি—যেমন বেগুন, করলা, ঢ্যাঁড়শ, ও পটোল—এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে।
ঝিঙে ও চিচিঙ্গার মতো সাধারণ পণের দরও ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা কাঁচা মরিচের বাজারে; দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার দোহাই দিয়ে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায়।
বিক্রেতাদের দাবি, দেশের প্রধান প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় খেতের ফসল ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আড়তে সরবরাহ একদম কমে গেছে এবং পাইকারি দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, কোনো দুর্যোগ দেখা দিলেই সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়।
অপরিবর্তিত চাল-তেল, উর্ধ্বমুখী মাছ ও প্রোটিন
সবজির পাশাপাশি প্রোটিনের উৎসগুলোর দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করলেও ডিমের ডজন উঠে গেছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায়। সামুদ্রিক বা নদীর মাছের বাজারও বেশ গরম; সাধারণ রুই, কার্পজাতীয় মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, আর এক কেজির ইলিশ কিনতে গুণতে হচ্ছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।
অন্যদিকে চাল ও সয়াবিন তেলের বাজারে নতুন করে বড় ধরণের পরিবর্তন না এলেও আগে থেকে বৃদ্ধি পাওয়া উচ্চমূল্যেই কেনাকাটা করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। টিসিবির ট্রাকের পেছনে প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘ সারি।
ভোক্তাদের আক্ষেপ
বাজার করতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বেতন তো এক টাকাও বাড়ে না, কিন্তু বাজারে এলে প্রতি সপ্তাহে জিনিসের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। কোনো তদারকি নেই, যে যার মতো দাম হাঁকাচ্ছে। জীবন চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।”
বাজার মনিটরিং ও বিশেষজ্ঞ মত
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আবহাওয়া বা বন্যার অজুহাত দিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি সমর্থন করা যায় না। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত অতিরিক্ত হাতবদল ও পরিবহন চাঁদাবাজিই পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঠিক তদারকি না থাকা এবং সিন্ডিকেটের অশুভ তৎপরতা বাজারে কারসাজি বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের দাবি, সরকার যদি অবিলম্বে পাইকারি বাজারগুলোতে কড়া নজরদারি চালু না করে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে আসন্ন দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র রূপ নিতে পারে। সাধারণ মানুষ এখন শুধু এটাই চায়—কথার ফুলঝুরি নয়, দ্রুত বাজারে স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।


